ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিত

মোস্তাফা জব্বার

মাননীয় মন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়


অনেকেই পড়ে থাকবেন খবরটা, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার গত ২৩ জানুয়ারি ১৬ খুব গুরুত্ব দিয়ে এটি প্রকাশ করেছিলো। দেশের অন্য মিডিয়াতেও এর প্রভাব পড়েছে। এই খবরের ওপর ভিত্তি করে একটি মিডিয়া থেকে আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসে নানা প্রশড়ব তুলে ধরেছিলো আমার সামনে। আমি ধারনা করি, যারা সচেতন তাদের অনেকেই এই খবরটি পড়ে নিজের মাঝেই নানা প্রশেড়বর জন্ম দিয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো বন্ধু বান্ধবকে প্রশড়ব করেছেন বা কেউ কেউ হয়তো গুগলে খুজেছেন এই খবরের পেছনের খবর পেতে। সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিল্পপতি ও রাষ্ট্রনায়ক কারও কাছেই খবরটি কম গরুত্ব বহন করেনা।

আসুন আগে খবরটির ভূমিকাটি পাঠ করি, “মানবসভ্যতার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত তিনটি শিল্পবিপ্লব পাল্টে দিয়েছে সারা বিশ্বের গতিপথ। প্রথম শিল্পবিপ্লবটি হয়েছিল ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে। এরপর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ ও ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের আবিষ্কার শিল্পবিপ্লবের গতিকে বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। তবে আগের তিনটি বিপ্লবকে ছাড়িয়ে যেতে পারে ডিজিটাল বিপ্লব। এ নিয়েই এখন সারা দুনিয়ায় তোলপাড় চলছে। এটিকে এখন বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব।”

ডিজিটাল বিপ্লবকে কেন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলা হচ্ছে, সেটি নিয়ে আলোচনার জন্য সারা বিশ্বের রাজনৈতিক নেতা, বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ ও বিশ্লেষকেরা জড়ো হয়েছিলেন সুইজারল্যান্ডের শহর দাভোসে। সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলনে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিলো চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। ডিজিটাল শিল্পবিপ্লবকে নিয়ে সেখানে হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা ও বিশ্লেষণ।

ইতিমধ্যেই ২০-২৩ জানুয়ারি ১৬ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মূলত এই সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয়ই ছিলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। স্মরণ করা ভালো ২০১৭ সালেও একই স্থানে ১৭-২০ জানুয়ারি আরও একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৭ সালের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ত্বে একটি প্রতিনিধি দলও অংশ গ্রহণ করে। এই সম্মেলনে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং দুনিয়ার রূপান্তরটি নিয়ে অনেক বেশি চর্চা হয়েছে। তবে নানা প্রেক্ষিত বিবেচনায় ১৬ সালের সেেম্মলনটি ডিজিটাল শিল্প বিপ্লবের জন্য অনেক বেশি আলোচিত।

২০১৬ সালের সম্মেলনে ব্যাপকভাবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বিষয়টি আলোচিত হয় এবং সম্মেলনে চমৎকার সব উপাত্ত প্রকাশিত হয়। http://www.weforum.org/events/world-economic-forum-annual-meeting-2016 । খবরটি আমাকে কিছুটা অবাক করেছে। কারণ দুনিয়ার এতো বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী মানুষেরা এতোদিন পরে ডিজিটাল বিপ্লবের বিষয়টি টের পেলেন আর এটাকে এতোদিন পরে এটিকে আরও একটি শিল্প বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করলেন কেন? মানব সভ্যতার ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে এদেরতো ভুল হবার কথা নয়। এর আগে অ্যালভিন টফলারের মতো মানুষেরা মানব সভ্যতার বিকাশে কৃষি যুগের পর একটি শিল্প বিপ্লবের কথাই বলেছেন। তিনি ডিজিটাল বিপ্লবকে মানবসভ্যতার তৃতীয় বিপ্লব বলেছিলেন। তার হিসাবটি ছিলো যে মানুষ কৃষি বিপ্লব করেছে এরপর শিল্প বিপ্লব করেছে এবং তৃতীয় বিপ্লবটিই হচ্ছে ডিজিটাল বিপ্লব। ১৯২৮ সালে আমেরিকার নিউইয়র্কে জন্ম নেয়া অ্যালভিন টফলার তার ধারনা প্রকাশ করেছেন এভাবে; First Wave is the society after agrarian revolution and replaced the first hunter-gatherer cultures.Second Wave is the society during the Industrial Revolution (ca. late 17th century through the mid-20th century). The main components of the Second Wave society are nuclear family, factory-type education system, and the corporation..

টফলার লিখেন: “The Second Wave Society is industrial and based on mass production, mass distribution, mass consumption, mass education, mass media, mass recreation, mass entertainment, and weapons of mass destruction. You combine those things with standardization, centralization, concentration, and synchronization, and you wind up with a style of organization we call bureaucracy.” টফলারের এই বিবরণের কোন তূলনা নাই। তিনি অতি সামান্য কথায় এতো সুন্দরভাবে শিল্প বিপ্লব ও তার পরের সমাজ ও তার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছেন যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায়না। তিনি পরের বিপ্লবটাকেই তৃতীয় বিপ্লব বলেছেন। তার নিজের কাছে এই তৃতীয় বিপ্লবটি হচ্ছে তথ্য যুগ, মহাকাশ যুগ, ইলেকট্রনিক যুগ, গ্লোবাল ভিলেজ বা প্রযুক্তি যুগ। Third Wave is the post-industrial society. According to Toffler, since the late 1950s, most nations have been moving away from a Second Wave Society into what he would call a Third Wave Society, one based on actionable knowledge as a primary resource. His description of this (super-industrial society) details into other writers’ concepts (like theInformation Age, Space Age, Electronic Era, Global Village, technetronic age, scientific-technological
revolution), which to various degrees predicted demassification, diversity, knowledge-based production, and the acceleration of change (one of Toffler’s key maxims is “change is non-linear and can go backwards, forwards and sideways”).
টফলার ডিজিটাল যুগটির পুরো চরিত্র ব্যাখ্যা করতে সক্ষম না হলেও অন্তত এটি বোঝাতে পেরেছেন যে উৎপাদন ব্যবস্থা জ্ঞানভিত্তিক হবে।

তবে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের নেতাদের ভাষ্য আমাকে হতাশ করেছে। তাদের মতামত অনুসারে কেবলমাত্র বিদ্যুৎ একটি শিল্প বিপ্লব সংঘটিত করেছে বলে আমি মনে করিনা। বরং বাষ্পীয় ইঞ্জিন থেকে আজ পর্যন্ত মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেই শিল্প বিপ্লব গড়ে ওঠেছে। এসব প্রযুক্তিকে শিল্প বিপ্লবের তিনটি স্তর অবশ্যই বলা যায়। তবে ইন্টারনেট একটি শিল্প বিপ্লব সংঘটিত করেছে নাকি একটি সভ্যতার জন্ম দিয়েছে সেটিও আমাদেরকে স্থির করতে হবে। অন্যদিকে একটি শিল্প বিপ্লবকেই আবিষ্কারসমূহ আরও গতিশীল করেছে কিনা সেটি উপলব্ধি করার বিষয়। আমার নিজের কাছে বিস্ময়ের বিষয় যে তারা কি টফলারের বইটিও পড়েননি? নাকি পড়ে থাকলেও সেটিকে পাস কাটিয়ে গেছেন?

প্রথম আলোর খবরে উল্লেখ ছিলো যে, “ডব্লিউইএফের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান ক্লাউস শোয়াব চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে নিজের লেখা একটি প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমরা চাই বা না চাই, এত দিন পর্যন্ত আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম, চিন্তাচেতনা যেভাবে চলেছে সেটা বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ভিত্তির ওপর শুরু হওয়া ডিজিটাল এ বিপ্লবের ফলে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে গাণিতিক হারে, যা আগে কখনো হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে এ পরিবর্তন প্রভাব ফেলছে, যার ফলে পাল্টে যাচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা, এমনকি রাষ্ট্র চালানোর প্রক্রিয়া

। ডিজিটাল বিপ্লব কী, সে বিষয়টিরও বিশদ একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ক্লাউস শোয়াব। স্মার্টফোনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন, ইন্টারনেট অব থিংস, যন্ত্রপাতি পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, রোবোটিকস, জৈবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো বিষয়গুলো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনা করেছে বলে তিনি মনে করেন। ডিজিটাল বিপ্লবের এই শক্তির চিত্রটি বিশ্বব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন এক দিনে বিশ্বে ২০ হাজার ৭০০ কোটি ই-মেইল পাঠানো হয়, গুগলে ৪২০ কোটি বিভিনড়ব বিষয় খোঁজা হয়। এক যুগ আগেও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ পরিবর্তনগুলো ছিল অকল্পনীয়।

ডিজিটাল বিপ্লব সম্পর্কে বহুজাতিক মোবাইল অপারেটর ডিজিসেলের চেয়ারম্যান ডেনিস ও ব্রায়েন বলেন, ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হিসেবে ডিজিটালাইজেশন আমাদের কাজের সব ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, তবে এই পরিবর্তনকে আমি দেখি সূচনা হিসেবে। আগামী ১০ বছরে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে আমরা এমন সব পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, যা এর আগে ৫০ বছরে সম্ভব হয়নি।’চতুর্থ এই শিল্পবিপ্লব সারা বিশ্বের মানুষের জীবনমান উনড়বয়নে কী প্রভাব ফেলবে, সেটি নিয়ে দুই ধরনের মত পাওয়া যাচ্ছে। একদল বিশেষজ্ঞ বলছেন, এর ফলে সব মানুষেরই আয়ের পরিমাণ ও জীবনমান বাডবে। বিশ্বের পণ্য সরবরাহ প্রμিয়াতেও ডিজিটাল প্রযুক্তি আনবে ব্যাপক পরিবর্তন। এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য পাঠানোর খরচ অনেক কমে আসবে, ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। তবে আরেক দল অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বের অসাম্য ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষের দ্বারা সম্পনড়ব অনেক কাজ রোবট ও যন্ত্রপাতি দিয়ে সম্পনড়ব করা হবে, এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে তা সমস্যা তৈরি করবে। এ ছাডা শ্রমবাজারে অল্প কর্মদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ও বাজার কমে যাবে, যা উনড়বয়নশীল দেশগুলোকে বেশি করে সমস্যায় ফেলবে। ডিজিটাল বিপ্লবের আরও একটি সমস্যা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এর ফলে সারা বিশ্বে সম্পদ বৈষম্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাড়বে বলে অনেকের আশঙ্কা। ডিজিটাল প্রযুক্তির আবিষ্কারক, বিনিয়োগকারী দেশগুলো এর থেকে যতটা লাভবান হবে, অন্য দেশগুলো সেটা থেকে বঞ্চিত হবে। বিষয়টিকে জয়ী পক্ষের সব ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল বিপ্লবের প্রভাবও হবে ব্যাপক। ব্যতিμমী পণ্যসেবার পাশাপাশি নিয়ত পরিবর্তনশীল গ্রাহক চাহিদা পূরণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সরকার পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণেও ডিজিটাল বিপ্লব আনবে বড় পরিবর্তন। প্রযুক্তি বিপ্লব সরকারি সেবাকে একদিকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসবে, অন্যদিকে বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের সহজলভ্যতা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঝুঁকিও বাড়াবে। নিরাপত্তা ঝুঁকির এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবই যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করবে, সেই আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকেরা।” অর্থনীতি ফোরামের নেতারা নিজেদেরকে অনেক প-িত বিবেচনা করে এসব নিয়ে এতোদিনে আলোচনা করলেও দুনিয়ার বহু মানুষ এই সময়টিকে ডিজিটাল সভ্যতার সময় হিসেবে অনেক আগেই চিহ্নিত করেছেন। খোদ জাতিসংঘ একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের কথাও বলেছে। সম্মেলন-কর্মসূচি প্রতিদিনই ডিজিটাল বিপ্লবকে ঘিরেই প্রণীত হচ্ছে। আমি অবাক হই যে তারা এতোদিন ঘুমিয়ে ছিলেন কেন? তারা কি গুগলের প্রধান নির্বাহি এরিক স্মিথ এবং পরিচালক র্জাড কোহেন-এর দি নিউ ডিজিটাল এজ বইটিও পড়েননি? তারা কি এটিও জানেনা যে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যখন অনুনড়বত ট্যাগে যুক্ত ছিলো সেই ২০০৮ সালে ডিজিটাল রূপান্তরের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে? আমাদের অবশ্যই জানতে হবে যে তারা শেষাবধি ডিজিটাল বিপ্লবকে কেমনভাবে আলিঙ্গন করার কথা ভাবছেন।

অর্থনীতি ফোরামের সম্মেলনের পর তাদের ওয়েবসাইট থেকে যেসব তথ্য সংগ্রহ করা গেছে তার মধ্য থেকে কিছু মন্তব্য আমাদের চোখে পড়েছে। সাইটে আটটি বিশেষ মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। সেগুলো বস্তুত বিশ্বের ডিজিটাল রূপান্তরকেই প্রকাশ করে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের নির্বাহি চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা ক্লাওস সোয়াব মন্তব্য করেছেন, “We must develop a comprehensive and globally shared view of how technology is affecting our lives and reshaping our economic, social, cultural, and human environments. There has never been a time of greater promise, or greater peril.”  আমি ধারনা করি যে এই মন্তব্য আমাদেরকে সারা দুনিয়ার ডিজিটাল রূপান্তর সম্পর্ক একটি সাধারণ ধারনা পেতে সহায়তা করবে। সোয়াব সারা দুনিয়ার জন্য সুষ্পষ্ট ও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ধারনা তৈরি করার জন্য অনুরোধ করেছেন যাতে সবাই বুঝতে পারে যে, প্রযুক্তি কেমন করে মানুষের অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিক পরিবেশকে বদলাচ্ছে। তিনি মনে করেন যে, এমন সুযোগ বা চ্যালেঞ্জ এর আগে আর কখনও আসেনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষক দিলিপ জর্জ মন্তব্য করেছেন, “Imagine a robot capable of treating Ebola patients or cleaning up nuclear waste.” দিলিপ সবাইকে ভাবতে বলেছেন যে, এমন হতে পারে যে রোবাট ইবোলা ভাইরাসের রোগীদের চিকিৎসা করবে ও পারমানবিক বর্জ্য পরিষ্কার করবে।

একটি অসাধারণ তথ্য দিয়েছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েটো। তিনি জানিয়েছেন যে মেক্সিকো হচ্ছে দুনিয়ার প্রথম দেশ যে দেশ ব্রডব্যান্ড প্রাপ্তিকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার বলে সংবিধানে স্বীকৃতি দিয়েছে।
“Mexico is one of the only nations whose constitution recognizes the right of its people to a broadband internet connection.”

এটি নিসঃন্দেহে একটি অসাধারণ অর্জন। দুনিয়াবাসী অন্তত একটি দৃষ্টান্ত পেয়েছে যে অনড়ব, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সাথে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে থাকতে পারে। অন্যদিকে কিছু হতাশার চিত্রও আছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশ যে সমভাবে হয়নি সেই কথাও বলা হয়েছে। লয়েডস-এর প্রধান নির্বাহি ইনগা বিয়েল মনে করেন যে, দুনিয়ার বহু মানুষের স্মার্টফোনটাই একমাত্র কম্পিউটার। “For many people, the smartphone is the first and only computer they have.”
ডেলয়েট কনসাল্টিং-এর সিনিয়র গ্রাহক পরামর্শক গ্যারি কোলম্যান মনে করেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এখনও আতুড় ঘরে আছে। তবে ব্যবসা ও সমাজে দ্রুত পরিবর্তন ও প্রভাবের জন্য এতে যোগ দেবার এখনই সময়।

“The Fourth Industrial Revolution is still in its nascent state. But with the swift pace of change and disruption to business and society, the time to join in is now.”
কুডেলস্কি গ্রুপের প্রধান নির্বাহি আন্দ্রে কুদেলস্কি বলেন, একজন দক্ষ প্রকৌশলী যেকোন সংযুক্ত যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। সমাজ এই সক্ষমতার প্রভাব এখনও অনুভব করতে পারেনি।

“Any skilled engineer can take control remotely of any connected ‘thing’. Society has not yet realized the incredible scenarios this capability creates.”
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক নোবেল বিজয়ী রবার্ট জে শিলার বলেন, আপনি আগুনের বীমা করার জন্য ঘর পোড়া অবধি অপেক্ষা করতে পারেন না। আমরা সমাজে চরম অস্থিতিশীলতার জন্য অপেক্ষা করতে পারিনা। “You cannot wait until a house burns down to buy fire insurance on it. We cannot wait until there are massive dislocations in our society to prepare for the Fourth Industrial Revolution.”
নরওয়ের নাগরিক বিশ্ব রোযিং-এর চ্যাম্পিয়ন রবার্ট বারগিট কারস্টেইন বলেন, বিশ্বের চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রতিবন্দ্বীদের জন্য সুপার পাওয়ার দেবে।
“For people with a disability, the Fourth Industrial Revolution will give us super powers.”
একসেনচিওর-এর প্রধান নির্বাহি পিয়েরে নানটার্ম বলেন, শুধুমাত্র ডিজিটাল রূপান্তরের কারনে ২০০০ সালের পর ফরচুন ৫০০ কোম্পানীর অর্ধেক হারিয়ে গেছে। “Digital is the main reason just over half of the companies on the Fortune 500 have disappeared since the year 2000.”
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ বর্ণিত ও কথিত তিনটি শিল্প বিপ্লবের কোনটিতেই যথাসময়ে অংশ নিতে পারেনি। এই সেদিনও আমরা কৃষিনির্ভর একটি দেশ ছিলাম। কৃষিযুগের সমস্ত লক্ষ্মণ আমাদের সমাজে, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে তথা জীবনধারায় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিলো। ১৯৬৪ সালে আমরা কম্পিউটারের যুগে পা দিলেও এর প্রয়োগ ছিলো খুবই সীমিত। ব্রিটিশ-পাকিস্তান তাদের ঔপনিবেশিক শাসনে কখনও আমাদেরকে শিল্পযুগের উপযুক্ত হবার সুযোগই দেয়নি। বাংলাদেশের রূপান্তরের সময়টি শুরুই হয়েছে ১৯৭২ সালে। তার মাঝেও ৭৫ থেকে ৯১ সময়কালের সামরিক শাসন দেশটির সামনে চলার পথকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে।
৯১ পরবর্তী সরকারও দেশের আর্থ সামাজিক রূপান্তর বিষয়ে দুরদৃষ্টি নিয়ে তেমন কিছু ভাবতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরটি নিয়ে পদক্ষেপ নিতে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখেনা ২০০১ থেকে ২০০৮ সময়কালে শেখ হাসিনার নেতৃত্ত্বের ধারাবাহিকতা বজায় না থাকায় ২০০৯ থেকে দেশটির সামনে যাওয়ার পথটা আবার সুগম হয়। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা করে এই অঞ্চলই নয় সারা দুনিয়াকে প্রথম একটি ডিজিটাল সভ্যতা গড়ে ওঠার আভাস প্রদান করেন। বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র, কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই ঘোষণা কেবল দূরদৃষ্টিসম্পনড়বই ছিলোনা, এটি ছিলো দুনিয়াকে চোখে আঙুল দিয়ে একটি নতুন সভ্যতার জন্মকে দেখিয়ে দেয়া। সবাই জানেন, বাংলাদেশের পর ব্রিটেন ও ভারত ডিজিটাল রূপান্তরের কর্মসূচি ঘোষণা করে। আমার নিজের কথা যদি বলি তবে ডিজিটাল রূপান্তরের চর্চাটি শুরু করি ১৯৮৭ সালে। গননা যন্ত্র দিয়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনাকে বদলে দিয়ে শিক্ষাকে ডিজিটাল করার সরাসরি উদ্যোগ গ্রহণ করি ১৯৯৯ সালে। ডিজিটাল সভ্যতার রূপরেখা প্রকাশিত হয় প্রথমে ২০০৭ সালের মার্চ ও পরে ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ-এপ্রিল মাসে নানা মিডিয়াতে। তবে আমরা বড় সফলতা অর্জন করতে পারি শব্দটিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরে। যেহেতু শেখ হাসিনা সেই ঘোষণার পর সরকার গঠন করেন এবং নতুন প্রজন্ম অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে শেখ হাসিনার ঘোষণাকে স্বাগত জানায়, সেহেতু ডিজিটাল বাংলাদেশের চাকা সামনে যেতেই থাকে। এই সরকারের নয় বছরের অগ্রগতি এতোই ব্যাপক যে সার্বিকভাবে আমরা অনুনড়বত দেশের তালিকা থেকে উনড়বয়নশীল দেশে উনড়বীত হতে পেরেছি। প্রসঙ্গত এটিও উল্লেখ করা দরকার যে প্রধানমন্ত্রী শেথ হাসিনা দেশকে ডিজিটাল করার ধারনাটি তার পুত্র এবং সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এর কাছ থেকে পেয়েছেন সেটি তিনি নিজেই দেশবাসীকে জানিয়েছেন। আমরাও লক্ষ্য করেছি যে সজীব ওয়াজেদ জয় দেশটির ডিজিটাল রূপান্তরে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
ডিজিটাল রূপান্তরে আমাদের সমূহ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একটি ঔপনিবেশিক কাঠামোর আমলাতন্ত্র, কৃষি সমাজের রাজনীতি ও পুজিবাদী ধারার গতানুগতিক অর্থনীতির চাপে পড়ে আমরা সেই গতিতে যেতে পাছিনা যা আমাদের পক্ষে পারা সম্ভব।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করেছেন এবং অর্থনীতিকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথা বলার পরও কায়িক শ্রমকে মেধাশ্রম ও অ্যানালগ শিল্পকে মেধাশিল্পে রূপান্তরের চেষ্টার চ্যালেঞ্জ ব্যাপক।
তবে এটি গর্ব করার মতো যে সারা দুনিয়া যখন ডিজিটাল বিপ্লবের কথা বলছে তখন আমরা সেটি থেকে এগিয়েই আছি। আমাদের প্রচুর চ্যালেঞ্জ রয়েছে এই রূপান্তরে। বিশেষ করে আমরা যদি আমাদের মানবসম্পদকে ডিজিটাল যুগের উপযোগী করে গড়ে তুলতে না পারি তবে আমাদের অবস্থান দুনিয়ার তলানীতে থাকবে। তবে আমাদের সুযোগটা হচ্ছে যে আমাদের জনসংখ্যা নবীন এবং তারা আমাদের জন্য একটি বাড়তি সুবিধা দেবে। আমরা যেহেতু এখন আর পশ্চাদপদ থাকতে চাইনা সেহেতু আমাদের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। আমি নিজে মনে করি, মেধাসম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারলে আমরা দুনিয়াতে পিছিয়ে পড়তে পারিনা। অন্যদিকে আমাদেরকে অনুভব করতে হবে যে, ব্যক্তিগত বৈষম্য থেকে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বৈষম্যের ধারাটিও কার্লমার্ক্সের সংজ্ঞায় থাকবেনা। রাষ্ট্রের সীমানা, সংজ্ঞা বা অস্তিত্ত্ব ডিজিটাল যুগে ভিনড়বতর হবে এটি মাথায় রেখে এখনই সেই যুদ্ধে জয়ী হবার কৌশল নির্ধারণ করতে পারি।
আমার নিজের জন্য উপরের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার শেষ ধাপটি ছিলো ২০১৮ সালের মোবাইল বিশ্ব কংগ্রেসে যোগদান। ২৬, ২৭, ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১লা মার্চ ১৮ স্পেনের বার্সিলোনাতে আয়োজিত মোবাইল বিশ্ব কংগ্রেস দুনিয়ার সামনে ৫জিসহ যেসব প্রযুক্তি প্রদর্শণ করেছে তার থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরকে আগামী দিনের কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। আমার এই জীবনে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎকে এভাবে চাক্ষুষ দেখার সুযোগ এর আগে আর পাইনি। সেজন্যই পুরা কর্মসূচিতেই আমূল পরিবর্তন আনার সময় হয়েছে।
প্রেক্ষিত বাংলাদেশ॥ ডিজিটাল বিপ্লবের কৌশল: আমি মনে করি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে শরীক হতে এই মুহূর্তে আমাদের কৌশল হলো চারটি। এই কৌশলগুলো হলো ১. শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদ উনড়বয়ন, ২. সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর ও জনগণের সকল সেবা ডিজিটালকরণ ৩. শিল্প ও অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তর ৪. একটি ডিজিটাল জীবনধারা গড়ে তোলা ও বাংলাদেশকে জন্মের প্রতিজ্ঞায় গড়ে তোলা বিষয়ক। প্রথম কৌশলটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী মানব সম্পদ সৃষ্টি নিয়ে। আমরা এজন্য শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা আবশ্যক। দ্বিতীয় কৌশলটি সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর বা একটি ডিজিটাল সরকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ক। এর আওতায় সরকার পরিচালনা পদ্ধতি ডিজিটাল করা ছাড়াও জনগণের কাছে সকল সংস্থার সেবাকে ডিজিটাল উপায়ে উপস্থাপন করার বিসয়টিও রয়েছে। তৃতীয় কৌশলটি মূলত শিল্প ও অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তর। শিল্প-কল-কারখানা-ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির সকল ধারার ডিজিটাল রূপান্তর এর প্রধান উদ্দেশ্য। সামগ্রিকভাবে এই কৌশলের উদ্দেশ্য একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিও গড়ে তোলা। চতুর্থ কৌশলটি হলো তিনটি কৌশলের সম্মিলিত রূপ বা একটি ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলার স্বপড়ব পূরণ। একই সাথে একটি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িক চেতনার বিপরীতে একটি আধুনিক ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপড়ব এটি।
কৌশল ১: ডিজিটাল শিক্ষা ॥ শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদ উনড়বয়ন: বাংলাদেশের মতো একটি অতি জনবহুল দেশের জন্য দেশটির ডিজিটাল রূপান্তর এর প্রধানতম কৌশল হতে হবে এর মানবসম্পদকে সবার আগে ডিজিটাল যুগের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর করা। এদেশের মানবসম্পদের চরিত্র হচ্ছে যে, জনসংখ্যার শতকরা ৬৫ ভাগই পয়ত্রিশের নিচের বয়সী। শতকরা ৪৯ ভাগের বয়স ২৫ বছরের নিচে। ২০১৮ সালের শুরুতে শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যাই ছিলো প্রায় ৫ কোটি। ঘটনাচμে
ওরা এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে শিল্পযুগের প্রথম স্তরের দক্ষতা অর্জনে নিয়োজিত। ওরা দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের শিল্পায়নের কোন খবরও জানেনা। অন্যদের সিংহভাগ প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণে সক্ষম। অন্যদিকে বিদ্যমান জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারী, যাদের বড় অংশটি ঘর-কনড়বা ও কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও একটি স্বল্পশিক্ষিত নারী সমাজ পোশাক শিল্পে স্বল্পদক্ষ জনগোষ্ঠীতে লিপ্ত হয়ে গেছে। সামনের দিনে এই প্রবণতাটি থাকবেনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই›ট্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা এনালাইসস ও রোবোটিক্স এই অবস্থার পরিবর্তন করবে। ৫জি ইন্টারনেট বিশ্বটাকে বদলে দেবে। পোশাক শিল্পে একদিকে স্বল্প দক্ষ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমবে-অন্যদিকে দক্ষ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। এই খাতটিতে এই ধরনের আরও অনেক দক্ষ নারীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকায় এদেরকে আরও দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়। এজন্য এই খাতে যথাযথ উচ্চ দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারী সমাজের জন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যথাযথ নয়। এদেরকে ডিজিটাল যুগের শিক্ষা দিতে হবে। সুখের বিষয় যে, ডিজিটাল যুগে নারীদের কর্মক্ষেত্র এতো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে যে, তাদেরকে আর পশ্চাদপদ বলে গণ্য করার মতো অবস্থা বিরাজ করছেনা।
মানবসম্পদ সৃষ্টির প্রধান ধারাটি তাই নতুন রূপে গড়ে ওঠতে হবে। প্রচলিত ধারার শিক্ষায় নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জ্ঞানকর্মী বানাতে হলে প্রথমে প্রচলিত শিক্ষার ধারাকে বদলাতে হবে। এজন্য আমরা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কৃষি শ্রমিক বা শিল্প শ্রমিক গড়ে তোলার কারখানা থেকে ডিজিটাল কর্মী তৈরি করার কারখানায় পরিবর্তন করতে পারি। আমাদের নিজের দেশে বা বাইরের দুনিয়াতে কায়িক শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক ও শিল্প শ্রমিক হিসেবে যাদেরকে কাজে লাগানো যাবে তার বাইরের পুরো জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম ডিজিটাল কাজে সুদক্ষ তথা ডিজিটাল কর্মীতে রূপান্তর করতে হবে। বস্তুত প্রচলিত ধারার শ্রমশক্তি গড়ে তোলার বাড়তি কোন প্রয়োজনীয়তা হয়তো আমাদের থাকবেনা। কারণ যে তিরিশোর্ধ জনগোষ্ঠী রয়েছে, বা যারা ইতিমধ্যেই প্রচলিত ধারার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছে এবং আরও বহু বছর পেতে থাকবে তাদের প্রচলিত কাজ করার দক্ষতা থাকছে এবং তারাই এই খাতের চাহিদা মিটিয়ে ফেলতে পারবে। বরং এই জনগোষ্ঠী এখনই বেকারত্বের যন্ত্রণায় ভুগছে। ফলে নতুন প্রজন্মকে ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার সহায়তায় জ্ঞানকর্মী বানানোর কাজটাই আমাদেরকে সর্বাগ্রে করতে হবে। এর হিসাবটি একেবারেই সহজ। বিদ্যমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবিলম্বে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে। এটি বস্তুত একটি রূপান্তর। প্রচলিত দালানকোঠা, চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চি বহাল রাখলেও এর শিক্ষকের যোগ্যতা, শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করতে হবে।
আমি ছয়টি ধারায় এই রূপান্তরের মোদ্দা কথাটা বলতে চাই।
ক. প্রথমত প্রোগ্রামিংসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি শিশুশ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্য করতে হবে। প্রাথমিক স্তরে ৫০ নাম্বার হলেও মাধ্যমিক স্তরে ১০০ ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিষয়টির মান হতে হবে ২০০। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা, ইংরেজি-বাংলা-আরবি মাধ্যম নির্বিশেষে সকলের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য হতে হবে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরিক্ষায় বিষয়টিকে অপশনাল নয়, বাধ্যতামূলক করতে হবে। এজন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই খাতের অবস্থাটি নাজুক। স্কুল ও কলেজ স্তরে শতকরা ৪০ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নেই। এমনকি যারা শিক্ষকতা করছে তারা এমপিওভুক্ত নয়। এই সংকট কাটিয়ে তুলতে হবে।
খ. দ্বিতীয়ত প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি ২০ জন ছাত্রের জন্য একটি করে কম্পিউটার/ ল্যাপটপ আনুপাতিক হিসেবে কম্পিউটার ল্যাব গড়ে তুলতে হবে। এই কম্পিউটারগুলো শিক্ষার্থীদেরকে হাতে কলমে ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করতে শেখাবে। একই সাথে শিক্ষার্থীরা যাতে সহজে নিজেরা এমন যন্ত্রের স্বত্ত্বাধিকারী হতে পারে রাষ্ট্রকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষায় ইন্টারনেট ব্যবহারকে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়ত্ত্বের মাঝে আনতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিণামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিতে হবে। দেশজুড়ে বিণামূল্যের ওয়াইফাই জোন গড়ে তুললে শিক্ষায় ইন্টারনেটের ব্যবহারকে সম্প্রসারিত করবে। ইন্টারনেটকে শিক্ষার সম্প্রসারণের বাহক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে হবে এবং ইন্টারনেটেকে সাশ্রয়ী করতে হবে।
গ. তৃতীয়ত প্রতিটি ক্লাশরুমকে ডিজিটাল ক্লাশরুম বানাতে হবে। প্রচলিত চক, ডাস্টার, খাতা কলম বইকে কম্পিউটার, ট্যাবলেট পিসি, স্মার্ট ফোন, বড় পর্দার মনিটর/টিভি বা প্রজেক্টর দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। প্রচলিত স্কুলের অবকাঠামোকে ডিজিটাল ক্লাশরুমের উপযুক্ত করে তৈরি করতে হবে।
ঘ. চতুর্থত সকল পাঠ্য বিষয়কে ডিজিটাল যুগের জ্ঞানকর্মী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য উপযোগী পাঠμম ও বিষয় নির্ধারণ করে সেইসব কনটেন্টসকে ডিজিটাল কনটেন্টে পরিণত করতে হবে। পরীক্ষা পদ্ধতি বা মূল্যায়নকেও ডিজিটাল করতে হবে। অবশ্যই বিদ্যমান পাঠμম হুবহু অনুসরণ করা যাবেনা এবং ডিজিটাল ক্লাশরুমে কেবলমাত্র কাগজের বই দিয়ে শিক্ষা দান করা যাবেনা। কনটেন্ট যদি ডিজিটাল না হয় তবে ডিজিটাল ক্লাশরুম অচল হয়ে যাবে। এইসব কনটেন্টকে মাল্টিমিডিয়া ও ইন্টারএ্যাকটিভ হতে হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ডিজিটাল যুগের বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী বিষয়বস্তু শিক্ষা দেয়া। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় কার্যত এমনসব বিষয়ে পাঠদান করা হয় যা কৃষি বা শিল্পযুগের উপযোগী। ডিজিটাল যুগের বিষয়গুলো আমাদের দেশে পড়ানোই হয়না। সেইসব বিষয় বাছাই করে তার জন্য পাঠμম তৈরি করতে হবে।
ঙ. পঞ্চমত: সকল শিক্ষককে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সকল আয়োজন বিফলে যাবে যদি শিক্ষকগণ ডিজিটাল কনটেন্ট, ডিজিটাল ক্লাশরুম ব্যবহার করতে না পারেন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করতে না জানেন। তারা নিজেরা যাতে কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন তারও প্রশিক্ষণ তাদেরকে দিতে হবে। কিন্তু শিক্ষকগণ কোন অবস্থাতেই পেশাদারী কনটেন্ট তৈরি করতে পারবেন না। ফলে পেশাদারী কনটেন্টস তৈরির একটি চলমান প্রμিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। প্রস্তাবিত ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল শিক্ষার গবেষণা ও প্রয়োগে নেতৃত্ব দেবার উপযোগী করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। μমান্বয়ে সকল বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে।
চ. ষষ্ঠত; তিরিশের নিচের সকল মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বজুড়ে যে কাজের বাজার আছে সেই বাজার অনুপাতে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের যেসব মানবসম্পদ বিষয়ক প্রকল্প রয়েছে তাকে কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে হবে। দেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এজন্য সরকার স্থাপিত ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্রসমূহও ব্যবহৃত হতে পারে। আমি বিশেষ করে বিশ্বব্যাঙ্কের এলআইসিটি প্রকল্প, বেসিসের প্রশিক্ষণ প্রকল্পসহ, আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও অন্যান্য মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রকল্পগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য অনুরোধ করছি। এখনও প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের ধারা বাস্তবমুখী ও সঠিক নয়।
ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাটি হবে সরকারের জন্য কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। এখনও যেখানে শিক্ষার হারই ৭০ এর কাছে এবং যেখানে আমরা কেবল শিল্পযুগের শিক্ষায় আছি তাতে এটি হচ্ছে একটি মহাযজ্ঞ। তবে শিক্ষার রূপান্তর ছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা ভাবাই যায়না।
কৌশল ২: ডিজিটাল সরকার॥ সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর ও জনগণের সকল সেবা ডিজিটালকরণ রাষ্ট্র ও সমাজের ডিজিটাল রূপান্তরের আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, সরকার নামক প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত প্রাচীন। এর পরিচালনা পদ্ধতিও মান্ধাতার আমলের। আমরা এখন আধুনিক রাষ্ট্র নামক যে রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলি এবং জনগণের সেবক সরকার হিসেবে যে সরকারকে চিহ্নিত করি তার ব্যবস্থাপনা বস্তুত প্রাগৈতেহাসিক। এক সময়ে রাজরাজড়ারা সরকার চালাতেন। তবে সেই ব্যবস্থাকে স্থলাভিষিক্ত করেছে ব্রিটিশদের সরকার ব্যবস্থা। সেটি আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করে আসছি। ব্রিটিশরা চলে যাবার এতোদিন পরও সেই ব্যবস্থা প্রবল দাপটের সাথে রাজত্ব করছে। কথা ছিলো সরকারটি অন্তত শিল্পযুগের উপযোগী হবে এবং তার দক্ষতাও সেই পর্যায়ের হবে। কিন্তু কৃষি যুগে থেকেই আমরা শিল্পযুগের সরকার চালাতে শুরু করার ফলে মানসিকতাসহ সকল পর্যায়েই আমাদের সংকট চরম পর্যায়ের। একদিকে সামন্ত মানসিকতা ও অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিকতা সরকারকে আষ্টেপিষ্টে বেধে রেখেছে। ৪৭ সালের একবার ও ৭১ সালে আরেকবার পতাকা বদলের পরও ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র বদলায়নি। একটি স্বাধীন জাতির জন্য যে ধরনের প্রশাসন গড়ে ওঠা দরকার সেটিও গড়ে ওঠেনি। কাজ করার পদ্ধতি রয়ে গেছে আগের মতো। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।
ক. প্রথমত সরকারি অফিসে কাগজের ব্যবহার μমান্বয়ে বন্ধ করতে হবে। ২১ সালের পর সরকারী অফিসে কাগজ ব্যবহার করা যাবেনা। সরকারের সকল অফিস, দপ্তর, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় কাগজকে ডিজিটাল পদ্ধতি দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। এজন্য সরকার যেসব সেবা জনগণকে প্রদান করে তার সবই ডিজিটাল পদ্ধতিতে দিতে হবে। এখানেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি দপ্তরের বিদ্যমান ফাইলকে ডিজিটাল ডকুমেন্টে রূপান্তরিত করতে হবে। নতুন ডকুমেন্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে তৈরি করতে হবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতেই সংরক্ষণ ও বিতরণ করতে হবে। এইসব ডকুমেন্টের ডিজিটাল ব্যবহার এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রμিয়া ডিজিটাল করতে হবে। সরকারের মন্ত্রীবর্গসহ এর রাজনৈতিক অংশকেও এজন্য দক্ষ হতে হবে। সংসদকে ডিজিটাল হতে হবে। সংসদ সদস্যদেরকেও হতে হবে ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহারে দক্ষ। বিচার বিভাগকে কোনভাবেই প্রচলিত রূপে রাখা যাবেনা। মামলা মোকদ্দমার বিবরণসহ, বিচার কার্যμম পরিচালনা সম্পূর্ণ ডিজিটাল হতে হবে। বিচারক ও আইনজীবিদেরকে ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। সরকারের আইনশ্ক্ষৃলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ, ভূমি ব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সাথে সম্পৃক্ত সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করতে হবে। সরকারের কাছে থাকা অতীতের সকল তথ্য ডিজিটাল করতে হবে।
খ. দ্বিতীয়ত সরকারের সকল কর্মচারি-কর্মকর্তাকে ডিজিটাল যন্ত্র দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে জানতে হবে। এজন্য সকল কর্মচারি কর্মকর্তাকে ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নতুন নিয়োগের সময় একটি বাধ্যতামূলক শর্ত থাকতে হবে যে, সরকার যেমন ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাজ করবে সরকারে নিয়োগপ্রাপ্তদেরকে সেই পদ্ধতিতে কাজ করতে পারতে হবে। হতে পারে যে, প্রচলিত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ থেকে এই যোগ্যতা কারও পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হবেনা। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োগের শর্ত হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির সাধারণ জ্ঞানকে একটি শর্ত হিসেবে রেখে এদের সকলের জন্য নতুন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। জন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের বিসয়টি গুরুত্ব দিয়ে মেখাতে হবে।
গ. তৃতীয়ত সকল সরকারি অফিসকে বাধ্যতামূলকভাবে নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে হবে এবং সকল কর্মকা- অনলাইনে প্রকাশিত হতে হবে। সরকারের কর্মকর্তা কর্মচারিদেরকেও সার্বক্ষণিকভাবে নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে হবে। সরকার যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছে তার সাথে ডাটা সেন্টার স্থাপন, ডাটা সেন্টারের ব্যাকআপ তৈরি বা আরও প্রাসঙ্গিক কাজগুলো করতে হবে।
ঘ. চতুর্থত সরকারের সকল সেবা জনগণের কাছে পৌছানোর জন্য জনগণের দোড়গোড়ায় সেবাকেন্দ্র থাকতে হবে। যদিও এরই মাঝে ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে তথাপি সিটি কর্পোরেশন ও তার প্রতি ওয়ার্ডে, পৌরসভা ও তার প্রতি ওয়ার্ডে এবং সামাজিক কেন্দ্র, বাজার, ডাকঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। দেশজুড়ে থাকতে হবে বিণামূল্যের ওয়াইফাই জোন। জনগণকে সরকারের সাথে যুক্ত হবার প্রযুক্তি ব্যবহারকে সকল সুযোগ দিতে হবে। থ্রিজির প্রচলন এই বিষয়টিকে সহায়তা করলেও, এর ট্যারিফ এবং সহজলভ্যতার চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করতে হবে। সারা দেশে বিণামূল্যের ওয়াইফাই ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে।
ঙ. পঞ্চমত; দেশের বিদ্যমান সকল আইনকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী করতে হবে এবং সেই অনুপাতে আইন ও বিচারবিভাগ ও আইনশৃক্সক্ষলা প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রকে মেধাসম্পদ রক্ষা ও ডিজিটাল অপরাধ মোকাবেলায় সকল প্রকারের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
চ. ষষ্ঠত; সরকারের সাথে যুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে ডিজিটাল করতে হবে। অর্থনীতি, শিল্প-কল কারখানা, মেধাসম্পদ, আইন-বিচার, আইনশৃক্সক্ষলা রক্ষাকারি বাহিনী ও সামরিক বাহিনীকে ডিজিটাল করতে হবে।
মাত্র ছয়টি করে পয়েন্টে যতো ছোট করে আমি কাজগুলোর কথা উল্লেখ করেছি তাতে মনে হতে পারে খুব সহজেই বোধহয় সব হয়ে যাবে। কিন্তু আমি মনে করি সরকার যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও ২০২১ সালে একটি ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে হিমশিম খাবে। আমি নিজে মনে করি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে সরকার তার নিজের প্রশাসনকে ডিজিটাল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। সরকারের জনবলের মাঝে প্রযুক্তি ব্যবহারের অদক্ষতা ছাড়াও আছে দুর্নীতির প্রকোপ। ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হলে সরকারের দুর্ণীতিবাজ আমলারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা ডিজিটাল রূপান্তরের প্রμিয়াকে ঠেকিয়ে দেবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ভূমি, বিচার, আইনশৃক্সক্ষলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দুর্নীতির কোটারি আছে। এই খাতগুলোতে যদি কঠোরভাবে ডিজিটাল রূপান্তরের প্রয়াস গ্রহণ না করা হয় তবে ডিজিটাল সরকারের ধারনাই ভেস্তে যাবে।
কৌশল ৩ ডিজিটাল শিল্প ও অর্থনীতি॥ শিল্প ও অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তর শিক্ষা এবং সরকার ডিজিটাল কবার পর যা খুব দ্রুত ডিজিটাল হতে হবে তা হলো অর্থনীতি। শিল্প-কল কারখানা-ব্যবসা-বাণিজ্য যদি প্রচলিত ধারার বাইরে বের হতে না পারে তবে যেমন করে আমারে অব্যন্তরীণ বাজার অন্যের দখলে যাবে তেমনি আমরা প্রতিযোগিতায় দুনিয়াতে টিকে থাকতে পারবনা। আজকের দুনিয়াতে ব্যবসা বাণিজ্য ডিজিটাল হওয়াটা নতুন কোন ঘটনাই নয়। শিল্প কল কারখানা যদি ডিজিটাল না হয় তবে সেটিও দুনিয়াতে টিকে থাকতে পারবেনা। এজন্য আমার কয়েকটি সুপারিশ হলো:
ক) ব্যবসার কেনাকাটা, লেনদেনে ডিজিটাল করতে হবে। একটি কাগজের মুদ্রাবিহীন বাণিজ্যব্যবস্থা থেকে একটি ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
খ) ব্যবসার ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করতে হবে। প্রচলিত খাতা কলমের হিসাব-নিকাশ বা হাজিরা-বেতনকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে।
গ) উৎপাদন ব্যবস্থার যেখানে যেখানে ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করা যায় সেখানে সেখানে ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স বা আইটি প্রযুক্তির সহায়তা নিতে হবে।
ঘ) ব্যবসার সাথে যুক্ত সকলকে ডিজিটাল শিক্ষায় শিক্ষত করতে হবে। সাধারণ শিল্পযুগের দক্ষতা দিয়ে যে ডিজিটাপল যুগের ব্যবসা-বাণিজ্য করা যাবেনা তা সবাইকে বুঝতে হবে এবং সবাইকে সেভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে।
ঙ) ব্যবসা বা শিল্পের ধরনকে সৃজনশীল খাতে প্রবাহিত করতে হবে। সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও আবিষ।কারকে ভিত্তি করে প্রচলিত পন্যকে সৃজনশীল পণ্যে রূপান্তর করতে হবে
চ) সরকারকে তার অর্থনৈতিক কর্মসূচি জ্ঞানভিত্তিক কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে হবে। সরকারের সকল পরিকল্পনাও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিকে বিবেচনায় রেখে করতে হবে। আমরা যে ২০৪১ সালে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলবো এবং আমাদের অর্থনীতি যে জ্ঞানভিত্তিক অর্তনীতি হবে সেটি বিবেচনায় নিয়ে সকল অর্থনৈতিক কর্মকা- করতে হবে।
আমাদের মনে রাখা দরকার যে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ছাড়া একটি উনড়বত দেশ গড়ার স্বপড়ব কখনও পূরণ হবেনা।
কৌশল ৪: ডিজিটাল জীবনধারা॥ ডিজিটাল জীবনধারা ও জন্মের ঠিকানায় রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হবে ডিজিটাল জীবনধারা গড়ে তোলা। দেশের সকল নাগরিককে ডিজিটাল যন্ত্র-প্রযুক্তি দিয়ে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে এবং তার চারপাশে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে যাতে তার জীবনধারাটি ডিজিটাল হয়ে যায়।
আমি এই কৌশলের জন্যও ছয়টি কর্ম পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করছি।
ক. দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারে সক্ষম প্রতিটি নাগরিকের জন্য কমপক্ষে ১ এমবিপিএস ব্যান্ডউইদথ সুলভ হতে হবে। দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে এই গতি নিরবচ্ছিনড়বভাবে যাতে পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে দেশের সকল সিটি কর্পোরেশন,
পৌরসভা, জেলা-উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারি অফিস-আদালত, শহরের প্রধান প্রধান পাবলিক প্লেস, বড় বড় হাটবাজার ইত্যাদি স্থানে ওয়াইফাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। অন্যদিকে রেডিও-টিভিসহ বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- সকল ব্যবস্থা ইন্টারনেটে-মোবাইলে প্রাপ্য হতে হবে। প্রচলিত পদ্ধতির অফিস-আদালত-শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি অনলাইন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বলা যেতে পারে এটি হবে ইন্টারনেট সভ্যতা।
খ. ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কল-কারখানা, কৃষি, স্বাস্থ্য সেবা, আইন-আদালত, সালিশ, সরকারি সেবা, হাট বাজার, জলমহাল, ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ জীবনের সামগ্রিক কর্মকা- ডিজিটাল করতে হবে। জনগণ যেন এসব সেবা তার হাতের নাগালে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে।
গ. মেধাশিল্প ও সেবাখাতকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পনীতি তৈরি করতে হবে। দেশের সকল প্রান্তে জ্ঞানভিত্তিক শিল্প-ব্যবসা বাণিজ্যকে এভাবে বিকশিত করতে হবে যাতে জনগণ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে সরাসরি অংশ নিতে পারে।
ঘ. দেশের সকল আইনকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী করতে হবে। মেধা সংরক্ষণ ও এর পরিচর্যার পাশাপাশি সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ঙ. ডিজিটাল বৈষম্যসহ সমাজে বিরাজমান সকল বৈষম্য দূর করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে অনড়ব, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানসহ জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
চ. বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে তার জন্মের অঙ্গীকারে স্থাপন করার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার পাশাপাশি দেশকে জঙ্গীবাদ, ধর্মান্ধতা, সন্ত্রাস ইত্যাদির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে এবং একাত্তরের ঘোষণা অনুযায়ী দেশের নীতি ও আদর্শকে গড়ে তুলতে হবে।
দেশটা ডিজিটাল হলো কিনা তার প্যারামিটার কিন্তু ডিজিটাল জীবনধারা দিয়েই দেখতে হবে। ফলে এই কৌশলটির দিকে তাকিয়েই আমরা অনুভব করবো কতোটা পথ হেটেছি আমরা।
সার্বিক বিবেচনায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ কেবলমাত্র প্রযুক্তির প্রয়োগ নয়, এটি বস্তুত একটি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলন। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। ধর্মভিত্তিক জঙ্গী রাষ্ট্র গড়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়া যায়না। বরং ডিজিটাল বাংলাদেশ আন্দোলনটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রবাহমান ধারারই অংশ। এই ধারার দুই প্রান্তে যে দুই ধারার মানুষেরা অবস্থান করছে তার একটি সমীকরণ করা প্রয়োজন। খুব স্পষ্ট করে এটি বলা দরকার যে, এই রেখার একদিকে রয়েছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং অন্যদিকে রয়েছে একাত্তরের বিজয়ীরা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে লড়াই-এর এই মাত্রাটি জনগণের মাঝে তেমনভাবে স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা, ৬ এপ্রিল ১৮ ॥ লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক ॥ ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net, www.bijoydigital.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *